গুগল প্লে স্টোরে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ প্রকাশনার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত গাইডলাইন: একটি বিস্তৃত গবেষণা প্রতিবেদন
১. নির্বাহী সারসংক্ষেপ (Executive Summary)
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (DFS) এর দ্রুত বিকাশ এবং গুগল প্লে স্টোরের (Google Play Store) মতো গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে আর্থিক অ্যাপ্লিকেশনের প্রকাশনা একটি জটিল ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। যখন একজন ডেভেলপার বা একটি প্রতিষ্ঠান গুগল প্লে স্টোরে একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ প্রকাশ করতে চায়, তখন তাকে দুটি প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নীতিমালার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়: প্রথমত, গুগল (Google) এর নিজস্ব 'ডেভেলপার প্রোগ্রাম পলিসি' এবং 'ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস পলিসি', এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank) কর্তৃক নির্ধারিত স্থানীয় আর্থিক প্রবিধান ও লাইসেন্সিং কাঠামো। এই প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো এই দুটি ভিন্ন অথচ পরস্পর সম্পর্কিত ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং আইনি বাধ্যবাধকতাগুলোর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রদান করা।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, গুগল প্লে স্টোরে একটি ব্যাংকিং অ্যাপ সফলভাবে পাবলিশ করার জন্য শুধুমাত্র একটি APK বা AAB ফাইল আপলোড করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য 'অর্গানাইজেশন ভেরিফিকেশন' (Organization Verification), 'ডি-ইউ-এন-এস নাম্বার' (D-U-N-S Number), এবং 'ফিনান্সিয়াল ফিচারস ডিক্লারেশন' (Financial Features Declaration) এর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়। গুগলের নীতি অনুযায়ী, কোনো অ্যাপ যদি ব্যবহারকারীদের অর্থ লেনদেন বা আর্থিক পণ্য (যেমন: ঋণ, সঞ্চয়, পেমেন্ট) ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তবে সেই অ্যাপের প্রকাশক বা ডেভেলপারকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক) দ্বারা লাইসেন্সপ্রাপ্ত হতে হবে।
এই প্রতিবেদনে আমরা দেখাব যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (PSD) থেকে প্রাপ্ত 'পেমেন্ট সার্ভিস প্রভাইডার' (PSP) লাইসেন্স, 'পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর' (PSO) লাইসেন্স, অথবা 'মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস' (MFS) লাইসেন্স—এইগুলোই মূলত সেই 'ডকুমেন্ট' যা গুগল প্লে কনসোলে জমা দিতে হয়। এই লাইসেন্সগুলো প্রাপ্তির জন্য পেড-আপ ক্যাপিটাল (Paid-up Capital), প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, এবং পরিচালনার স্বচ্ছতার যে দলিলপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয়, সেগুলো পরোক্ষভাবে গুগল প্লে-র কমপ্লায়েন্সের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের 'পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট' (Payment and Settlement Systems Act, 2024) এবং ২০২৫ সালের খসড়া 'ই-মানি ইস্যুয়ার রেগুলেশনস' (Draft E-Money Issuer Regulations)-এর প্রেক্ষাপটে নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
২. গুগল প্লে কনসোল ভেরিফিকেশন এবং প্রাথমিক নথিপত্র
যেকোনো মোবাইল অ্যাপ প্রকাশের প্রথম ধাপ হলো গুগল প্লে কনসোলে একটি ডেভেলপার অ্যাকাউন্ট তৈরি করা। তবে, একটি সাধারণ গেম বা ইউটিলিটি অ্যাপ এবং একটি ব্যাংকিং অ্যাপের মধ্যে অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। ব্যাংকিং অ্যাপের ক্ষেত্রে গুগল অত্যন্ত কঠোর 'নো ইউর কাস্টমার' (KYC) এবং 'নো ইউর বিজনেস' (KYB) নীতি অনুসরণ করে।
২.১ ডেভেলপার অ্যাকাউন্টের ধরণ নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয়তা
মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ প্রকাশের জন্য 'ব্যক্তিগত' (Personal) ডেভেলপার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গুগল প্লে পলিসি অনুযায়ী, আর্থিক লেনদেন পরিচালনাকারী অ্যাপগুলোকে অবশ্যই একটি 'অর্গানাইজেশন' (Organization) বা প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টের অধীনে প্রকাশ করতে হয়। এর কারণ হলো আইনি দায়বদ্ধতা (Legal Liability) এবং ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা 1।
প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের জন্য নিম্নোক্ত নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রাখা আবশ্যক:
১. প্রাতিষ্ঠানিক ইমেল এবং ফোন নম্বর: জিমেইল (Gmail) বা ইয়াহু (Yahoo) এর মতো সাধারণ ইমেলের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইন সম্বলিত ইমেল (যেমন: admin@bankname.com) ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। এটি গুগলের কাছে প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব প্রমাণ করে 3।
২. অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: প্রতিষ্ঠানের একটি সচল ওয়েবসাইট থাকতে হবে যা অ্যাপের 'গোপনীয়তা নীতি' (Privacy Policy) এবং সাপোর্ট পেজের সাথে লিংকড থাকবে।
২.২ ডি-ইউ-এন-এস (D-U-N-S) নাম্বারের অপরিহার্যতা
২০২৩ সালের পরবর্তী সময় থেকে, গুগল প্লে কনসোলে নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য 'D-U-N-S Number' প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি 'Dun & Bradstreet' নামক আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত একটি নয়-সংখ্যার অনন্য শনাক্তকারী কোড, যা বিশ্বব্যাপী ব্যবসার অস্তিত্ব যাচাই করতে ব্যবহৃত হয় 3।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে এই ডকুমেন্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গুগল আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম এবং ঠিকানা ঠিক সেভাবেই যাচাই করবে, যেভাবে তা Dun & Bradstreet-এর ডেটাবেসে সংরক্ষিত আছে।
D-U-N-S নাম্বার প্রাপ্তির জন্য এবং গুগলে জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র:
ট্রেড লাইসেন্স (Trade License): স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স। এটি প্রতিষ্ঠানের আইনি অস্তিত্ব এবং ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে 5।
ইনকর্পোরেশন সার্টিফিকেট (Certificate of Incorporation): 'রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস' (RJSC) থেকে প্রাপ্ত সনদ। ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক কারণ এগুলো সাধারণত লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় 5।
ইউটিলিটি বিল: প্রতিষ্ঠানের ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিলের কপি। গুগলের কাছে ঠিকানা যাচাইকরণের জন্য এটি একটি শক্তিশালী দলিল।
অন্তর্দৃষ্টি (Insight): অনেক সময় দেখা যায়, ডেভেলপাররা ট্রেড লাইসেন্সে এক রকম ঠিকানা ব্যবহার করেন এবং গুগল প্লে কনসোলে অন্য রকম ঠিকানা ইনপুট দেন। এই অসামঞ্জস্যের কারণে ভেরিফিকেশন ব্যর্থ হয়। সুতরাং, D-U-N-S প্রোফাইল, ট্রেড লাইসেন্স এবং গুগল প্লে কনসোলের তথ্য শতভাগ এক হতে হবে 3।
২.৩ অথরাইজড রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি যাচাইকরণ
প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব প্রমাণের পর, গুগল জানতে চায়—কে এই অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছেন। একে বলা হয় 'Authorized Representative Verification'। এই ধাপে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর জন্য নিচের যেকোনো একটি নথির স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে:
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): স্মার্ট এনআইডি কার্ড সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য দলিল।
পাসপোর্ট (Passport): মেয়াদউত্তীর্ণ নয় এমন আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট।
ড্রাইভিং লাইসেন্স (Driving License): ছবি এবং নাম স্পষ্ট এমন লাইসেন্স 1।
গুগল এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে নিশ্চিত করে যে, অ্যাকাউন্টটি কোনো 'বট' বা ভুয়া সত্তা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না। বিশেষ করে আর্থিক অ্যাপের ক্ষেত্রে, যদি ভবিষ্যতে কোনো জালিয়াতি বা নীতি লঙ্ঘন হয়, তবে গুগল যেন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে, তার জন্যই এই কঠোরতা 6।
৩. আর্থিক পরিষেবা নীতি এবং লাইসেন্সিং ডকুমেন্টেশন
গুগল প্লে স্টোরের 'Financial Services Policy' বা আর্থিক পরিষেবা নীতি হলো সেই গেটওয়ে, যা অতিক্রম না করলে কোনো ব্যাংকিং অ্যাপ লাইভ করা সম্ভব নয়। এই নীতির মূল কথা হলো: "আপনি যদি ব্যবহারকারীদের আর্থিক পণ্য বা সেবা প্রদান করেন, তবে আপনাকে অবশ্যই সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অনুগত হতে হবে" 8। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধান মেনে চলা।
৩.১ ফিনান্সিয়াল ফিচারস ডিক্লারেশন (Financial Features Declaration)
অ্যাপ কনসোলের 'App Content' সেকশনে একটি ফর্ম থাকে যার নাম 'Financial features declaration'। এখানে ডেভেলপারকে জানাতে হয় তার অ্যাপটি কী ধরনের আর্থিক সেবা দিচ্ছে।
সেবা নির্বাচন: এখানে 'Banking', 'Mobile Payment', 'E-wallet', 'Personal Loan' ইত্যাদি অপশন থাকে। একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের জন্য সাধারণত 'Banking' এবং 'Mobile Payment' অপশনগুলো প্রযোজ্য হয় 9।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য: ডেভেলপারকে উল্লেখ করতে হবে যে তারা কোন সংস্থার অধীনে নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখানে "Bangladesh Bank" উল্লেখ করতে হবে।
লাইসেন্স আপলোড: এই ফর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রমাণপত্র আপলোড করা। গুগল সরাসরি জানতে চাইবে—"আপনার কি এই সেবা প্রদানের লাইসেন্স আছে?"। এখানে আপনাকে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত লাইসেন্সের পিডিএফ বা স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে 9।
৩.২ কোন লাইসেন্সটি জমা দিতে হবে? (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট)
এখানেই অধিকাংশ নতুন উদ্যোক্তা বা ডেভেলপার বিভ্রান্ত হন। "মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ" একটি সাধারণ শব্দ, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিভাষায় এর নির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা এবং লাইসেন্স ক্যাটাগরি রয়েছে। আপনি গুগলকে যে ডকুমেন্টটি দেবেন, তা নির্ভর করবে আপনার অ্যাপের কাজের ধরনের ওপর। নিচে প্রধান তিনটি লাইসেন্স ক্যাটাগরি বিশ্লেষণ করা হলো যা গুগলে জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে:
৩.২.১ পেমেন্ট সার্ভিস প্রভাইডার (PSP) লাইসেন্স
যদি আপনার অ্যাপটি একটি ই-ওয়ালেট (e-wallet) হয়, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা টাকা জমা রাখতে পারে, কেনাকাটা করতে পারে এবং ফান্ড ট্রান্সফার করতে পারে (যেমন: iPay, Pathao Pay), তবে আপনার প্রয়োজন PSP লাইসেন্স।
নথিপত্র হিসেবে গুরুত্ব: গুগল প্লে কনসোলে PSP লাইসেন্স জমা দিলে গুগল বুঝবে যে আপনি 'E-money' ইস্যু করার জন্য বৈধভাবে অনুমোদিত 10।
সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ: PSP লাইসেন্সধারীরা সাধারণত সরাসরি এজেন্ট ব্যাংকিং বা ক্যাশ-আউট পয়েন্ট পরিচালনা করতে পারতেন না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া), কিন্তু তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে লিংক করে ফান্ড ট্রান্সফার সুবিধা দিতে পারেন। বর্তমানে ইন্টারঅপারেবিলিটি (Interoperability) বা 'বিনিময়' (Binimoy) চালুর ফলে এই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমেছে, কিন্তু লাইসেন্সের শর্তাবলী অনুযায়ী ডকুমেন্টেশন জমা দিতে হয় 10।
৩.২.২ মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) লাইসেন্স
যদি আপনার অ্যাপটি বিকাশ (bKash), রকেট (Rocket) বা নগদ (Nagad)-এর মতো হয়, যেখানে সারা দেশে এজেন্টের মাধ্যমে 'ক্যাশ-ইন' এবং 'ক্যাশ-আউট' (CICO) সুবিধা থাকে, তবে আপনার প্রয়োজন MFS লাইসেন্স।
লাইসেন্সের প্রকৃতি: বাংলাদেশে MFS মূলত 'ব্যাংক-লেড' (Bank-led) মডেল। অর্থাৎ, অ্যাপটি কোনো ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হতে হবে। গুগলকে দেখানোর জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আপনার অ্যাপটি যে প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত, সেই প্রতিষ্ঠানের ৫১% শেয়ার কোনো তফসিলি ব্যাংকের হাতে রয়েছে 11।
ডকুমেন্ট: বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (PSD) থেকে প্রাপ্ত 'No Objection Certificate (NOC)' এবং পরবর্তীতে প্রাপ্ত পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স।
৩.২.৩ পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (PSO) লাইসেন্স
যদি আপনার অ্যাপটি গ্রাহকদের সরাসরি টাকা রাখার সুযোগ না দিয়ে কেবল পেমেন্ট গেটওয়ে বা মার্চেন্ট পেমেন্ট প্রসেস করে (যেমন: SSLCommerz), তবে আপনার লাগবে PSO লাইসেন্স।
পার্থক্য: PSO-রা ই-মানি ইস্যু করতে পারে না। তাই গুগল কনসোলে ডিক্লারেশন ফর্মে 'E-wallet' নির্বাচন করলে এবং PSO লাইসেন্স জমা দিলে তা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন করা জরুরি 5।
৩.৩ নতুন যুগের লাইসেন্স: ডিজিটাল ব্যাংক এবং ই-মানি ইস্যুয়ার
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক আইনি সংস্কারের ফলে গুগল প্লে-র জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের তালিকায় নতুন সংযোজন এসেছে।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স: ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া শুরু করেছে। এই লাইসেন্সধারীরা কোনো শাখা ছাড়াই সম্পূর্ণ অ্যাপ-ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিতে পারবে। গুগল প্লে-তে এই অ্যাপ পাবলিশ করার জন্য 'ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স'-এর কপি জমা দেওয়া আবশ্যক, যা প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানটি আমানত গ্রহণ এবং ঋণ প্রদানে সক্ষম 10।
ডেডিকেটেড ই-মানি ইস্যুয়ার (DEMI): ২০২৫ সালের খসড়া প্রবিধান অনুযায়ী, ব্যাংক ছাড়াও স্বাধীন ফিনটেক কোম্পানিগুলো 'ডেডিকেটেড ই-মানি ইস্যুয়ার' হিসেবে লাইসেন্স পেতে পারে। এটি কার্যকর হলে, গুগল প্লে-তে নন-ব্যাংক ফিনটেক অ্যাপগুলোর জন্য নতুন এক ধরনের লাইসেন্স জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে 15।
৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং প্রক্রিয়া (যা গুগলের চাহিদার ভিত্তি)
গুগল প্লে-তে জমা দেওয়ার জন্য যে 'লাইসেন্স' বা অনুমোদনপত্র প্রয়োজন, তা পেতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করতে হয়। একজন ডেভেলপার বা উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার জানা দরকার যে, এই লাইসেন্সটি আসলে কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, কারণ অ্যাপের 'Data Safety' ফর্মে এই তথ্যগুলোর প্রতিফলন থাকতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের 'পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট' (PSD) এবং 'বাংলাদেশ পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস রেগুলেশনস, ২০১৪' (BPSSR 2014) অনুযায়ী লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি দুটি ধাপে বিভক্ত:
৪.১ ধাপ ১: নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC)
প্রাথমিক অনুমোদনের জন্য আবেদনকারীকে নিচের নথিপত্রগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয় 5:
আবেদন ফি: ২৫,০০০ টাকার অফেরতযোগ্য পে-অর্ডার।
কোম্পানি ডকুমেন্ট: মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (MoA), আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (AoA), ফরম-XII, টিআইএন (TIN)।
ব্যবসায়িক পরিকল্পনা (Business Plan): আগামী ৫ বছরের ব্যবসায়িক প্রক্ষেপণ, আয়ের উৎস, এবং ব্রেক-ইভেন বিশ্লেষণ।
পরিচালকদের তথ্য: সকল পরিচালকের সিভি (CV), সিআইবি (CIB) ক্লিয়ারেন্স (ঋণ খেলাপি কি না তা যাচাইয়ের জন্য), এবং দেউলিয়া না হওয়ার ঘোষণা 5।
প্রযুক্তিগত নকশা (Technical Architecture): অ্যাপের ডাটা ফ্লো ডায়াগ্রাম, সার্ভার লোকেশন (যা অবশ্যই বাংলাদেশে হতে হবে), এবং নেটওয়ার্ক টপোলজি।
অন্তর্দৃষ্টি (Insight): গুগল যখন অ্যাপের 'নিরাপত্তা' বা 'ডাটা সেফটি' নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন এই ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া 'টেকনিক্যাল আর্কিটেকচার' ডকুমেন্টটিই আপনার মূল রেফারেন্স। আপনি গুগলে যা ঘোষণা করবেন (যেমন: এনক্রিপশন পদ্ধতি), তা অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া নকশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৪.২ ধাপ ২: চূড়ান্ত লাইসেন্স (Final License) বা 'Go-Live'
NOC পাওয়ার পর, প্রতিষ্ঠানটিকে অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন দল সরেজমিনে যাচাই করে। সব ঠিক থাকলে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা লাইসেন্স ফি জমা দিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায় 5।
ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট (Trust Cum Settlement Account): PSP এবং MFS-এর জন্য গ্রাহকের টাকা রাখার জন্য একটি ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। অ্যাপটি পাবলিশ করার সময় গুগলের কাছে প্রমাণ করতে হতে পারে যে, গ্রাহকের টাকা নিরাপদ এবং তা অ্যাপ পরিচালনাকারীর নিজস্ব টাকার সাথে মিশে যাচ্ছে না 11।
ক্যাপিটাল বা মূলধন:
PSP: ন্যূনতম ২০ কোটি টাকা 10।
MFS: ন্যূনতম ৪৫ কোটি টাকা 10।
ডিজিটাল ব্যাংক: ১২৫ কোটি টাকা (প্রস্তাবিত ৩০০ কোটি টাকা) 14।
PSO: ৫০ লক্ষ টাকা
